যে কারণে মালয়েশিয়ানদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশী পোশাক

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের হাংতুয়া এলাকা। তৈরি পোশাকের হোল সেলের সারি সারি দোকান। এসব দোকানের বিক্রেতা প্রায় সবই বাংলাদেশি। ক্রেতা মালয়েশিয়া, চীন, ভারত, নেপাল, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও নেপালের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। চোখে দেখলেই মন ভরে যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রস্তুত করা পোশাক মালয়েশিয়ার হোল সেল ছাড়াও বিভিন্ন শপিং মলে শোভা পাচ্ছে। বয়স্ক, যুবক, তরুণ, শিশু-কিশোর, ছেলে-মেয়েদের রংবেরঙের টি-শার্ট, জিন্সের ফুলপ্যান্ট, শর্ট প্যান্ট, শার্ট, গোল গলার গেঞ্জি, হাতাওয়ালা গেঞ্জিসহ নারী-পুরুষের সব ধরনের পোশাকেরই দেখা মেলে হোল সেলের দোকানগুলোতে। সব শ্রেণির ক্রেতার মানানসই পোশাক মেলে এ এলাকায়। জানা যায়, গুণগত মান ও সুলভ মূল্যে আরামদায়ক পোশাক খুঁজতে মালয়েশিয়াবাসী কুয়ালালামপুরে পাইকারি বাজার হাংতুয়ায় ছুটে আসেন। এখানে পোশাক ব্যবসার সিংহভাগই এখন বাংলাদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। হোল সেলের দোকান হলেও এ এলাকায় তৈরি পোশাক খুচরা মূল্যেও বিক্রি করা হয়। এই বাজারে পাঁচ শতাধিক দোকানের চারশই বাংলাদেশি। দিন দিন এসব পোশাকের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। এখান থেকে পাইকারি কেনা তৈরি পোশাক যায় মালয়েশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে। বিশেষ করে কুয়ালালামপুরের বড় বড় শপিং মলে, পূর্ব মালয়েশিয়ার সাবাহ, সারওয়াক, জোহরবারু, পেনাংসহ প্রভৃতি স্থানে যায় বাংলাদেশি তৈরি পোশাক। তবে আসিয়ানভুক্ত অন্যান্য দেশের মতো তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি করা অন্যান্য পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চান বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব পণ্য বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সাভারসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়ত সিঅ্যান্ডএফের মাধ্যমে কনটেইনার ও লাগেজে করে মালয়েশিয়ায় আসছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি তৈরি পোশাকশিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে কাজ করছে বাংলাদেশি গার্মেন্টস ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ইন মালয়েশিয়া (বিজিটিএএম)। বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহযোগিতা পেলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা তাদের নিজেদের দোকানের পোশাক কিনতে প্রতিদিন হাংতুয়া এলাকায় আসেন। বাংলাদেশি দোকানগুলোতে তাদের ভিড় দেখা যায়। মালয়েশিয়া ছাড়াও চীন, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও নেপালের নাগরিকদেরও দেখা যায় বাংলাদেশি দোকানগুলোতে। নিজের কিংবা পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক কিনতে আসেন তারা। ২০/এ হাংতুয়ায় বিএম ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশি প্রবাসী হাবিবুর রহমান রতন। তার সঙ্গে ব্যবসা করছেন মনিরুজ্জামান। তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার জনগণের কাছে বাংলাদেশি পোশাক বেশি পছন্দ। অন্যান্য দেশের পাশাপাশি প্রায় ৮-১০ লাখ বাংলাদেশিও মালয়েশিয়ায় থাকেন। পোশাকের মান ভালো এবং দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় সবাই ঘুরেফিরে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ দেখেই কেনেন। আমাদের পণ্যগুলো শুল্কমুক্ত হলে বাংলাদেশ আরও লাভবান হতো।’ ওই এলাকায় ক্লাসিক ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী মামুন সিরাজুন্নবী শরিফ বলেন, ‘মালয়েশীয়রা বাংলাদেশি পোশাক পছন্দ করেন। নানা প্রতিকূল পরিবেশেও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের পোশাকের বাজার ভালো অবস্থানেই আছে। দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরালো হলে পোশাকে মালয়েশিয়ায় একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারবে বাংলাদেশ। এতে শুধু আমরাই নই, সরকারও লাভবান হবে।’ জানা যায়, সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় ডলারের বিপরীতে রিঙ্গিতের মান কিছুটা কমলেও গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকে আছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশি দোকানগুলোর মালিক ও বিক্রয়কর্মীরা মালয় ভাষায় পারদর্শী হওয়ায় এবং তাদের সুন্দর ব্যবহারের কারণে ক্রেতারা সহজেই আকৃষ্ট হন। এখান থেকে কেনা পণ্য যাচ্ছে সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায়। এসব দোকানে কাজ করছেন বাংলাদেশি ও মালয় নারী-পুরুষ কর্মীরা। এদিকে শুল্ক বৈষম্যের কারণে মালয়েশিয়ায় অন্যান্য পণ্য রপ্তানিতেও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। দেশটিতে আসিয়ানভুক্ত থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ফ্রুট, ড্রিঙ্কস ও বেভারেজ পণ্য রপ্তানি করছে বিনা শুল্কে। অথচ বাংলাদেশের একই পণ্য রপ্তানিতে গুনতে হচ্ছে ৩০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক। অতিরিক্ত এ শুল্ক দিতে গিয়ে অন্যান্য দেশের তুলনায় রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। জানা যায়, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য, ইলিশ, চিংড়ি, কাঁকড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, মসলা, সেমাই, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, আলু, শাক-সবজি, সিরামিক টেবিলওয়্যার, হিমায়িত মাছ, তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল ও হালাল খাদ্যপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারণে প্রাণ ও স্কয়ার গ্রুপের ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ২০টি ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রহিমআফরোজ। কয়েক বছর ধরে গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত অটোমোটিভ ব্যাটারি মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। মালয়েশিয়ার বাজারে ব্যাটারি রপ্তানি ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক ও সেলস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (এসএসটি) হিসেবে আরও ১০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে। যেখানে চীন ও ভারত থেকে আসা ব্যাটারি মালয়েশিয়ার বাজারে ঢুকছে বিনা শুল্কে