নুসরাত হত্যায় এবার ফেঁসে যাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ!

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় কারাগার থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশনা ছিল। তার নির্দেশনা অনুযায়ী রাফিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। আদালতে আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এই তথ্য।

পিবিআই সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, কারাবিধি লঙ্ঘন করে আলোচিত আসামি সিরাজের সঙ্গে তার ক্যাডার বাহিনীকে একান্ত সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়ায় এবার কারা কর্তৃপক্ষ ফেঁসে যেতে পারে।এছাড়া সিরাজের সঙ্গে সাক্ষাতের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং তথ্য জব্দ করা না হলে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সিরাজ মামলা থেকে বেঁচে যেতে পারেন বলে মনে করছেন নুসরাতের স্বজনরা।

কারাগারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কারাবিধি অনুযায়ী আলোচিত আসামির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের সময় একজন কারারক্ষী বা কারাকর্তৃপক্ষের যে কেউ উপস্থিত থাকার কথা। অথচ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে নুর উদ্দিন ও শামীমের একান্ত সাক্ষাতের সময় কেউ উপস্থিত ছিলো না। ফলে দীর্ঘ দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে তাদের কথোপকথন। এ সময় রাফিকে হত্যা করার ব্যাপারে সিরাজ উদদৌলা তাদের নির্দেশনা দেন। যদি কারা কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত থাকতো তাহলে রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা জানতে পারতো। ফলে তাকে পুড়িয়ে মারার মতো এমন ঘটনা হতো না বলেও ওই সূত্র দাবি করে।

অপরদিকে পিবিআই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয় যে, কারাগারে কোন আসামির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় জেল রক্ষী ছাড়া সাক্ষাৎ করা যায় কিনা। তিনি প্রশ্নের জবাবে জানান, জেল কোড সম্পর্কে তার জানা নেই।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, কারাগার থেকে সিরাজের নির্দেশে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় বিধি লঙ্ঘন করায় কারা কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না। তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।


পিবিআইর পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চাঞ্চল্যকর রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম ১৬৪ ধারায় ১৫ এপ্রিল ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাকির হোসেনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ধরে এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দিতে আদালতে সিরাজ উদ্দৌলা ও আওয়ামী লীগ নেতা রহুল আমিনের নির্দেশনা সমূহ নুর উদ্দিন ও শামীম বর্ণনা করেন।

জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন জানান, গত ৩ ও ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা করেন তিনি। সেখানে শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন ছিলো। তারা ‘আলেম সমাজকে হেয় করায় নুসরাতকে ‘একটি কঠিন সাজা দেওয়া’র জন্য সিরাজ উদদৌলার কাছে হুকুম চায়।

এই সময় শামীম নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দিলে এ প্রস্তাবে সায় দিয়ে সিরাজ উদ্দৌলা তার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘তোমরা কিছু একটা করো।’ একইসঙ্গে সিরাজ উদ্দৌলা এ নিয়ে ‘বেশ কিছু গোপন টিপস’ দেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নুর উদ্দিন।নুর উদ্দিন আরও জানায়, সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশনা পাওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল, শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন মাদ্রাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যা ৬ এপ্রিল বাস্তবায়ন করা হয়।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছেন, সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে তারা মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে থাকা টয়লেটে ওঁৎপেতে থাকে। এর আগে এক নারী সহযোগীকে দিয়ে তারা তিনটি বোরকা ও কেরোসিনের ব্যবস্থা করে। আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে তারা উম্মে সুলতানা পপিকে ছদ্মনাম শম্পাকে দিয়ে কৌশলে নুসরাতকে ছাদে নিয়ে আসে। এরপর নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে শামীম জানিয়েছে।

এ ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় আসামি শাহাদাত হোসেন স্বীকারোক্তিমূলক জাবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন জড়িত থাকার কথা। ফলে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় গত শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সোনাগাজী তাকিয়া রোডস্থ বাসভবন থেকে রুহুল আমিনকে আটক করে পিবিআই। পরদিন শনিবার বিকালে আদালতে গ্রেফতার দেখিয়ে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

রাফির ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, রাফির হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনিটরিং করছেন। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানান তিনি।ফেনী কারাগারের জেলার দিদারুল আলম জানান, এ ব্যাপারে আমি কোন তথ্য দিতে পারবো না। কোন তথ্য নিতে হলে আইনের আলোকে জেল সুপার বরাবর আবেদন করতে হবে।